এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :

১. সুপরিকল্পিত ‘মরণকামড়’: ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেই ভাষণটিই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের টার্নিং পয়েন্ট। নজরুল ইসলামের লেখা সেই আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছাত্র-জনতাকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে এবং শেখ হাসিনাকে জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২. কালো শাড়ির রহস্য: শোকের আবহ তৈরি করে সহমর্মিতা পাওয়ার বদলে জনমনে ঘৃণানছড়াতে শেখ হাসিনাকে ‘কালো শাড়ি’ পরার কু-পরামর্শ দিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম, যা ছিল নজরুলের সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ফাঁদ।
৩. দুই নৌকায় পা: পিএমও-তে থাকাকালীন সময়েও নজরুলের কক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং তারেক রহমানের স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমানের নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
৪. অর্থ উপার্জনের ‘মেশিন’: ডিসি-এসপিদের বাধ্য করে প্রধানমন্ত্রীর ওপর লেখা বই বিক্রি এবং চলচ্চিত্র জগতের ক্রেডিট চুরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
৫. রহস্যময় সুরক্ষা: ১৬ বছর শেখ হাসিনার ছায়াসঙ্গী হয়েও পতনের পর নজরুলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না হওয়া এবং তাঁর ছেলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চরম বিস্ময় ও সন্দেহের দানা বেঁধেছে।
“মূল বক্তব্য “
“নজরুল ইসলাম জানতেন কখন কোন শব্দ ব্যবহার করলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে। ১৭ জুলাইয়ের ভাষণে তিনি সেই বিষই ঢেলেছিলেন, যা শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্ষমতাকে এক নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দেয়। এটি কেবল একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল একজন
‘ইনসাইডারের’ চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন তাঁর প্রেস উইংয়ের সচিব ও স্পিচ রাইটার নজরুল ইসলাম। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সামনে আসছে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার, সহকর্মীদের সঙ্গে বিবাদ এবং সবশেষে আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পথে চালিত করার গুরুতর সব অভিযোগ। পিএমওর একাধিক সাবেক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্যমতে, নজরুল ইসলাম কেবল একজন ভাষণ লেখক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন গণভবনের ক্ষমতার অঘোষিত এক নিয়ন্ত্রক।
বিতর্কিত ১৭ জুলাইয়ের ভাষণ ও ‘কালো শাড়ি’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন #১৭ জুলাই জাতির উদ্দেশে শেখ হাসিনা যে ভাষণটি দেন, তার লেখক ছিলেন নজরুল ইসলাম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই ভাষণটি ছিল অত্যন্ত উস্কানিমূলক এবং তা হিতে বিপরীত হয়েছিল। ওই ভাষণে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি যে কঠোর অবস্থান ফুটে ওঠে, তা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পিএমওর একটি সূত্র জানায়, ওইদিন শেখ হাসিনাকে শোকের আবহ তৈরীতে ‘কালো শাড়ি’ পরার পরামর্শও নজরুল দিয়েছিলেন। একে
এখন অনেকেই একটি সুপরিকল্পিত ‘রাজনৈতিক সমাধি’ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছেন।
আর্থিক অনিয়ম ও অনধিকার চর্চা
নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও কম নয়। বিভিন্ন প্রকাশকের সঙ্গে আঁতাত করে শেখ হাসিনার ওপর বই প্রকাশ করে তিনি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) মাধ্যমে হাজার হাজার কপি বাধ্যতামূলকভাবে কিনিয়ে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর অনধিকার প্রবেশের কথা জানা যায়। অন্যের পরিচালনায় নির্মিত সিনেমার কৃতিত্ব নেওয়া এবং গণভবনের ‘পাস’ বা প্রবেশাধিকার বাণিজ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠদের নাম জড়িয়ে আছে।
দ্বিমুখী চরিত্রের অভিযোগ
তদন্তে দেখা গেছে, একদিকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সেজে সুবিধা নিতেন, অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ও বিএনপির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে
অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গণভবনে কর্মরত থাকা অবস্থায় বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে তাঁর গোপন যোগাযোগ ছিল বলে পিএমওর সাবেক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। আন্দোলন চলাকালীন নজরুলের ছেলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর ছেলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে কোটা বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
অব্যাহতি ও রহস্যজনক নীরবতা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির প্রায় সব শীর্ষ নেতা ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা আত্মগোপনে বা মামলার মুখে পড়লেও নজরুল ইসলাম ও তাঁর পরিবার এখনো ধরাছোঁয়ার
বাইরে। ১৬ বছর দাপটের সঙ্গে কাজ করার পর তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা না থাকায় জনমনে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।