গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকস্মিক পতনের নেপথ্যে কাজ করেছে তাঁর চারপাশের একটি শক্তিশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ এবং শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওপর তাঁর অন্ধ নির্ভরতা। শীর্ষ কর্মকর্তারা অত্যন্ত ‘সূক্ষ্ম কৌশলে’ তাঁকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে পুরোপুরি নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলেন এবং চূড়ান্ত মুহূর্তে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এ সাংবাদিক এনায়েত কবিরের লেখা ‘বাংলাদেশের মুখোশ উন্মোচন পর্ব ৭’ শীর্ষক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এসব দাবি করা হয়েছে।
সর্বনাশা ‘চট্টগ্রাম বলয়’ ও গোয়েন্দা নির্ভরতা
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার সুযোগ থাকলেও শেখ রেহানা ও সালমান এফ রহমানের প্ররোচনায় সেনাপ্রধান, ডিজিএফআই ও এনএসআই প্রধানদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করেন হাসিনা। নির্বাচনের আগে থেকেই তাঁর চারপাশে একটি শক্তিশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ গড়ে উঠেছিল। এই বলয়ের মূল কুশীলব ছিলেন:
প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি মোহাম্মদ কায়কোবাদ
এনএসআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসাইন আল মোর্শেদ
ডিজিএফআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক
এ ছাড়া সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবির আহমেদ এবং প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খানও এই বলয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
রাজনৈতিক নেতাদের বদলে এই কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করাই ছিল শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল।
৬ সমন্বয়ক আটকে রাখা ছিল ‘আত্মঘাতী ফাঁদ’
নর্থইস্ট নিউজের দাবি অনুযায়ী, ১৬ জুলাই থেকেই ডিজিএফআই ও এনএসআই মূলত সরকারের বিপক্ষে কাজ শুরু করে এবং আন্দোলনকে সশস্ত্র সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ডিবি কার্যালয়ে ৬ জন ছাত্রনেতাকে (সমন্বয়ক) আটকে রেখে জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতিতে স্বাক্ষর করানোর ঘটনাটি ছিল গোয়েন্দাদের পাতা আত্মঘাতী ফাঁদ, যা সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে।
গণভবনে হত্যার ছক ও ‘যুদ্ধপরিস্থিতি’ তৈরির পরিকল্পনা
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবিটি হলো, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে গণভবনে ক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ে হত্যার জন্য ফেলে রাখার একটি ছক কষা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশে একটি ‘যুদ্ধপরিস্থিতি’ তৈরি করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের হস্তক্ষেপের বৈধতা আদায় করা। কিন্তু ভারতের এক শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার সময়োচিত হস্তক্ষেপে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
যেভাবে চূড়ান্ত হয় পতনের ক্ষণ
৫ আগস্ট দুপুরে আর্টিলারি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার রফিকের নির্দেশে উত্তরা এলাকার ‘কারফিউর ব্যারিকেড’ হঠাৎ তুলে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ঢাকায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয় এবং সরকারের পতন নিশ্চিত হয়।
টুঙ্গিপাড়ার কথা বলে নেওয়া হয় বিমান ঘাঁটিতে
শেখ হাসিনা নিজেও সম্প্রতি দাবি করেছেন, ৫ আগস্ট তিনি ভেবেছিলেন নিরাপত্তার কারণে তাঁকে টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) পাহারায় তাঁকে কুর্মিটোলার বাশার ঘাঁটিতে নেওয়ার পরই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে এবং ক্ষমতা আর তাঁর হাতে নেই।
দেশত্যাগে ভারতীয় সেনাপ্রধানের ভূমিকা
৫ আগস্ট সকালেই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর কাছ থেকে সামরিক বিমানের ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশের পূর্বানুমতি নিয়ে রেখেছিলেন। দেশ ছাড়তে হাসিনা রাজি না থাকলেও ভারতীয় কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে তাঁকে ও শেখ রেহানাকে দ্রুত দিল্লিতে পাঠানো হয়।
জাতিসংঘের বিতর্কিত প্রস্তাব
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধি গুইন লুইস হাসিনাকে ঘিরে রাখা ওই শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি রামু সেনানিবাসকে স্থায়ী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ঘাঁটিতে রূপান্তর এবং রাখাইন অঞ্চলে একটি সামরিক করিডোর তৈরির বিতর্কিত প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।
পতন-পরবর্তী সামরিক বাহিনীর ‘বাছাইকৃত’ ভূমিকা
সরকার পতনের পর সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নর্থইস্ট নিউজ। আইএসপিআর সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ৬২৭ জনের তালিকা প্রকাশ করলেও সেখানে বৈষম্য ছিল। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের মতো অনেককে গ্রেপ্তার করা হলেও, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে যশোর সেনানিবাসের নিরাপদ রুট ব্যবহার করে ভারতে পালাতে সহায়তা করা হয়। ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল আকবর হোসাইন তাঁকে সহায়তা করেন।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, এই পটপরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ফলাফল ছিল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্বাসন। সেনাবাহিনী বিচার বিভাগকে রক্ষা না করে কেবল রাষ্ট্রপতির সুরক্ষায় মনোযোগ দেওয়ায় পুরো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অরাজক পরিস্থিতির মুখে পড়ে।