এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :
কোয়াডে যোগ না দেওয়া এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জেরে শেখ হাসিনার সরকার পতনের দীর্ঘমেয়াদি ছক কষেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কূটনীতিক হেলেন লা-ফেইভের বাসভবন ও নেপালের রিসোর্টে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারের ভেতরের খবর রাখার জন্য নাঈমুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও সুশীল সমাজের কয়েকজনের যুক্ত থাকার দাবি।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘমেয়াদি এক ‘বেসামরিক-সামরিক’ (সিভিল-মিলিটারি) ছক। আর এই পরিকল্পনার বীজ বোনা হয়েছিল খোদ মার্কিন কূটনীতিকের বাসভবন ও নেপালের একটি রিসোর্টে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ (QUAD) জোটে যোগ দিতে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের অস্বীকৃতি এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই এই পটপরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে বলে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু নথিতে দাবি করা হয়েছে।
ফাঁস হওয়া এসব নথির তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর ঘন ঘন ঢাকা সফরের প্রধান লক্ষ্যই ছিল এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের নীলনকশা বাস্তবায়ন।
গোপন বৈঠক ও অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা
নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ সালের অসমাপ্ত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনুগত অরাজনৈতিক সরকার গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। ২০২৩ সালে ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন কূটনীতিক হেলেন লা-ফেইভের বাসভবনে এবং নেপালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মনিকা চৌধুরীর মালিকানাধীন একটি রিসোর্টে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকগুলোতে হেলেন লা-ফেইভ ও তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ছাড়াও অনেক বাংলাদেশি নাগরিক উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। পিটার হাস ও ডোনাল্ড লু মূলত বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে মিলে এই সরকার পরিবর্তনের সমন্বয় করেন।
বয়ান তৈরি ও নাঈমুল ইসলাম খানের ভূমিকা
সরকার পরিবর্তনের এই ছকে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের একটি অংশকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ডোনাল্ড লুর নির্দেশনায় রাষ্ট্রদূত পিটার হাস যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শিক্ষাবিদ আলী রীয়াজকে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে জনমত গঠনের দায়িত্ব দেন। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের ভেতরের খবর রাখার জন্য নাঈমুল ইসলাম খানকে প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। নথিতে দাবি করা হয়, সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অভ্যন্তরীণ তথ্যগুলো নির্দিষ্ট মহলে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন তিনি।
পাশাপাশি ‘গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’–এর অভিযোগ প্রচারে কাজ করে আদিলুর রহমান শুভ্রর ‘অধিকার’ এবং সানজিদা তুলির ‘মায়ের ডাক’। অন্যদিকে, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম এবং ফরহাদ মজহারের মতো ব্যক্তিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক, বামপন্থী ও ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী এবং ‘রাষ্ট্র সংস্কার’–এর আকর্ষণীয় ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেন।
ভূরাজনীতি ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে সরে গেলে শেখ হাসিনা চীনের দ্বারস্থ হন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে যথাক্রমে রাশিয়া ও জাপানের সহায়তা নেন। যুক্তরাষ্ট্র এর বিপরীতে তাদের চীনবিরোধী নিরাপত্তাবলয় ‘কোয়াড’–এ যুক্ত হতে চাপ দিলে শেখ হাসিনা ‘আঞ্চলিক ভারসাম্য’–এর কথা বলে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলে রোহিঙ্গা সংকটের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে একটি ‘খ্রিষ্টান-ইহুদি’ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করেছে। ভারত, মিয়ানমারের রাখাইন ও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ তকমা দিয়ে আন্তর্জাতিক একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়, যার সঙ্গে সাবেক কয়েকজন বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন।
সামরিক-বেসামরিক যোগসূত্র ও ড. খলিলুর রহমান
২০০১ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. খলিলুর রহমান এই পটপরিবর্তনে অন্যতম প্রধান কুশীলব ছিলেন। ড. ইউনূসের সহায়তায় জাতিসংঘে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’, ক্লিনটন ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘের শীর্ষ পর্যায়ে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
জানা যায়, রামুর সেনানিবাসে জাতিসংঘের মানবিক করিডোর ও শান্তিরক্ষী ঘাঁটি স্থাপনের জন্য ড. ইউনূস ও ড. খলিলুর রহমান উদ্যোগ নিলেও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাতে ঘোর আপত্তি জানান। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করা যাবে না এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের এখতিয়ার।
বর্তমান পরিস্থিতি ও মার্কিন দূতের সাক্ষাৎ
নথিতে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের (২০২৬ সাল) চিত্রও উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং ড. খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ১৩ এপ্রিল (২০২৬) বাংলাদেশে নিযুক্ত বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টার এক দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান এবং ইলিশ মাছ খাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগির ফের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নজর দেবে এবং বাংলাদেশকে সামরিক চুক্তি আকসা (ACSA) ও জিসোমিয়া (GSOMIA)–তে সই করার জন্য চাপ প্রয়োগ করবে।